বাল্টিক অঞ্চলের ছোট আয়তনের দেশ লিথুয়ানিয়া, জনসংখ্যা প্রায় ২৯ লাখ। ইউরোপের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম ফিনটেক কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত আবির্ভূত হচ্ছে দেশটি। যেখানে রয়েছে ভিনটেড ও নর্ড সিকিউরিটির মতো ইউনিকর্নের সদর দপ্তর। এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে স্থানীয় ও বিদেশী ফিনটেক কোম্পানির কার্যক্রমে লিথুয়ানিয়া সরকারের দেয়া প্রথম শ্রেণীর সুবিধা ও ভারসাম্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ।
আর্থিক পরিষেবাকে সহায়তা দেয়া প্রযুক্তিকে ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি বা সংক্ষেপে ফিনটেক বলা হয়। ইউরো নিউজের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, ইউরোপের বাকি দেশগুলোর তুলনায় স্টার্টআপ বিশেষ করে ফিনটেকের ক্ষেত্রে বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠেছে লিথুয়ানিয়া।
লিথুয়ানিয়ার স্টার্টআপগুলো গত বছর বাল্টিক অঞ্চলে দ্রুততম বর্ধনশীল কোম্পানির তালিকায় নাম লিখিয়েছে। ‘লিথুয়ানিয়ান স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ২০২৩’ প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটির স্টার্টআপগুলোর সামগ্রিক এন্টারপ্রাইজ মূল্য বেড়েছে ৭ দশমিক ১ গুণ। একই সময়ে বাল্টিক অঞ্চলে এ হার ছিল ২ দশমিক ৭ এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে ৩ দশমিক ৬ গুণ।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কীভাবে লিথুয়ানিয়া ফিনটেক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করে? এর অন্যতম কারণ হলো, কর্মী ও কর্মপরিবেশে অগ্রাধিকার, শক্তিশালী সরকারি সমর্থন এবং সহজে ব্যবসা পরিচালনার সুবিধা।
উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ও দক্ষ কর্মীর প্রাচুর্য লিথুয়ানিয়ার প্রতি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করে। একই সঙ্গে দেশটির বিধিবিধান কর্মীদের সন্তুষ্টি ও কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়। এখানকার অফিসগুলো পরিষ্কার, নকশা আধুনিক, চিত্তাকর্ষক ও কর্মোদ্দীপক এবং খোলামেলা। সব মিলিয়ে এখানে রয়েছে স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ। এমন পরিবেশ, বিশেষ করে তরুণ কর্মীদের মানসিকতার সঙ্গে অনেক বেশি মানানসই। সাম্প্রতিক জরিপে হোস্টিঞ্জার, ট্রান্সফারগো, রেভোলুট ও কানেক্টপেসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির কর্মীরাই উচ্চ স্তরের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন।
লিথুয়ানিয়া সরকার ফিনটেক কোম্পানিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের সহযোগিতা দিয়ে থাকে। বিভিন্ন সরকারি প্লাটফর্মে যুক্ত থাকে এসব কোম্পানি। স্টার্টআপ লিথুয়ানিয়া, ইনোভেশন এজেন্সি লিথুয়ানিয়া, ইনভেস্ট লিথুয়ানিয়া, গো ভিলনিয়াস এবং ভিলনিয়াস টেকফিউশনসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা এখানে সহজ হয়ে উঠেছে।
সরকারি সমর্থনের মধ্যে রয়েছে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতাদের সংযুক্তীকরণ, দ্রুত কার্যক্রম সম্পাদনের প্রকল্প এবং কর্মশালা পরিচালনা। পাশাপাশি প্রকল্পে সমর্থন, পরামর্শসহ অনেক ধরনের সহায়তা দেয়া হয়। সরকারি সংস্থাগুলো ব্যবসা, কর্মী স্থানান্তর, প্রতিষ্ঠাতা, বিনিয়োগকারী ও আগ্রহীদের কোম্পানি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় সব তথ্যসেবা দিয়ে থাকে। কীভাবে ও কোথায় অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ি, ভালো স্কুল পাওয়া যাবে থেকে শুরু করে কর ও আইনগত বিষয়, স্থানান্তর পরিষেবা এবং আরো অনেক কিছু সরকারি সেবায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০২৪ সালের ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্স কম্পিটিটিভনেস ইনডেক্সে (আইটিসিআই) প্রতিযোগিতামূলক কর সুবিধায় লিথুয়ানিয়ার অবস্থান পঞ্চম। এছাড়া ইমার্জিং ইউরোপের বিজনেস ফ্রেন্ডলি সিটি পারসেপশন ইনডেক্স অনুযায়ী, ইউরোপের সবচেয়ে ব্যবসাবান্ধব শহরের মুকুট জিতেছে লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ও অন্যতম শহর ভিলনিয়াস। প্রতিভার জোগান, জীবনমান, ব্যবসায়িক পরিবেশ, সংযোগ ও অবকাঠামো, ব্র্যান্ড, স্মার্ট সিটি উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সমর্থন ইত্যাদি বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়েছিল এ সূচক।
প্রযুক্তি স্টার্টআপের বিকাশের পেছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে দেশটির ইন্টারনেট পরিষেবার। ইনভেস্ট লিথুয়ানিয়া অনুসারে, গড় ইন্টারনেট গতির ক্ষেত্রে লিথুয়ানিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে চতুর্থ স্থানে রয়েছে, যা রিমোট ওয়ার্কের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে বিশ্বে ভিলনিয়াসের অবস্থান অষ্টম। গো ভিলনিয়াসের তথ্য অনুযায়ী, শহরটিতে ২০টি কো-ওয়ার্কিং স্পেস রয়েছে এবং অনলাইন নিরাপত্তায় বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রয়েছে এ শহর।